Sleep Science

ঘুমের গুরুত্ব: সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি ও স্লিপ হাইজিন

Dr. Mohibulla Mollah 10 Min Read
Sleep Hygiene Guide

আধুনিক জীবনে ব্যস্ততা, কাজের চাপ ও প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে আমরা ঘুমের সাথে সবচেয়ে বেশি আপস করি। অথচ, ঘুম কেবল বিশ্রাম নেওয়া নয়; এটি আমাদের শরীরের প্রাকৃতিক 'মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ' (Repair and Maintenance) প্রক্রিয়া। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সুস্থ থাকার জন্য প্রতিদিন রাতে ৭-৯ ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, অপর্যাপ্ত ঘুম একটি বৈশ্বিক মহামারী। আজকের ব্লগে আমরা জানব "স্লিপ হাইজিন" বা ভালো ঘুমের অভ্যাস কীভাবে গড়ে তোলা যায় এবং কীভাবে অনিদ্রা দূর করা সম্ভব।

১. ঘুম কেন এত জরুরি? (The Science of Sleep)

ঘুমের সময় আমাদের মস্তিষ্ক এবং শরীর সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে কাজ করে। এই সময় আমাদের শরীর 'অ্যানাবলিক' (Anabolic) অবস্থায় থাকে, অর্থাৎ শরীর শক্তি সঞ্চয় করে এবং কোষ মেরামত করে।

  • মস্তিষ্কের ডিটক্সিফিকেশন: ঘুমের সময় মস্তিষ্ক থেকে 'বিটা-অ্যামাইলয়েড' (Beta-amyloid) নামক বিষাক্ত প্রোটিন পরিষ্কার হয়। এই প্রোটিন জমলে অ্যালঝেইমার্স রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
  • মেমোরি কনসলিডেশন: সারাদিন আমরা যা শিখি বা দেখি, তা ঘুমের সময় মস্তিষ্ক দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতিতে (Long-term Memory) রূপান্তর করে।
  • হরমোনের ভারসাম্য: ঘুমের সময় গ্রোথ হরমোন (Growth Hormone) নিঃসৃত হয় যা শিশুদের বৃদ্ধিতে এবং বড়দের কোষ মেরামতে সাহায্য করে। এছাড়া এটি ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন 'লেপটিন' ও 'ঘেরলিন'-এর ভারসাম্য বজায় রাখে।
  • ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ: ঘুমের সময় শরীর 'সাইটোকাইনস' (Cytokines) তৈরি করে, যা ইনফেকশনের বিরুদ্ধে লড়াই করে। একারণেই অসুস্থ হলে আমাদের বেশি ঘুম পায়।

২. ভালো ঘুমের ৭টি গোল্ডেন রুলস (Sleep Hygiene)

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ভালো ঘুমের জন্য পরিবেশ ও অভ্যাস পরিবর্তনকে 'স্লিপ হাইজিন' বলা হয়। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. নির্দিষ্ট সময় মেনে চলা (Circadian Rhythm)

আমাদের শরীরের ভেতরে একটি প্রাকৃতিক ঘড়ি আছে, যাকে 'সার্কাডিয়ান রিদম' বলে। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো এবং ঘুম থেকে উঠলে এই ঘড়িটি ঠিক থাকে। ছুটির দিনেও এই নিয়ম ভাঙবেন না। এতে শরীর নিজে থেকেই নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমের সংকেত দেবে।

২. ডিজিটাল ডিটক্স (Digital Detox) ও মেলাটোনিন

আমাদের মস্তিষ্কের পিনিয়াল গ্ল্যান্ড থেকে 'মেলাটোনিন' নামক হরমোন নিঃসৃত হয়, যা আমাদের ঘুম পাড়াতে সাহায্য করে। কিন্তু মোবাইল, ল্যাপটপ বা টিভির স্ক্রিন থেকে নির্গত 'নীল আলো' (Blue Light) এই হরমোন নিঃসরণ বন্ধ করে দেয়। ফলে মস্তিষ্ক মনে করে এখন দিন, এবং ঘুম আসে না। তাই ঘুমানোর অন্তত ১-২ ঘণ্টা আগে সব ধরনের স্ক্রিন থেকে দূরে থাকুন।

৩. ঘুমের পরিবেশ (Sleep Environment)

আপনার শোবার ঘরটি যেন ঘুমের মন্দির হয়।

  • অন্ধকার: ঘর সম্পূর্ণ অন্ধকার রাখুন। সামান্য আলোও মেলাটোনিন তৈরিতে বাধা দেয়। প্রয়োজনে আই মাস্ক ব্যবহার করুন।
  • তাপমাত্রা: খুব গরম বা খুব ঠান্ডা ঘরে ভালো ঘুম হয় না। ১৮-২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ঘুমের জন্য আদর্শ।
  • শব্দহীন: বাইরের শব্দ এড়াতে জানালা বন্ধ রাখুন বা ইয়ার প্লাগ ব্যবহার করুন।

৪. ক্যাফেইন ও খাদ্যাভ্যাস

ক্যাফেইন (চা, কফি, চকলেট) একটি উদ্দীপক যা ৬-৮ ঘণ্টা পর্যন্ত শরীরে থাকতে পারে। তাই দুপুর ২টার পর চা-কফি এড়িয়ে চলুন। এছাড়া রাতে ঘুমানোর ঠিক আগে ভারী বা মশলাদার খাবার খেলে এসিডিটি হতে পারে, যা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। ঘুমানোর ৩ ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করা উত্তম।

৫. দিনের বেলার ঘুম (Napping)

দুপুরে ২০ মিনিটের বেশি ঘুমানো (যাকে Power Nap বলে) ঠিক আছে, এতে কর্মক্ষমতা বাড়ে। কিন্তু দুপুরে ১-২ ঘণ্টা ঘুমালে রাতে 'স্লিপ প্রেশার' বা ঘুমের চাপ কমে যায়, ফলে রাতে ঘুম আসতে দেরি হয়।

৬. রিলাক্সেশন টেকনিক

ঘুমানোর আগে শরীর ও মনকে শান্ত করা জরুরি।

  • গরম পানিতে গোসল: এটি শরীরের তাপমাত্রা সামান্য কমিয়ে শিথিলতা আনে।
  • বই পড়া: কাগজের বই পড়া (ই-বুক নয়) চোখের ও মনের চাপ কমায়।
  • ডিপ ব্রিদিং: ৪-৭-৮ শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করলে নার্ভাস সিস্টেম শান্ত হয়।

৩. অনিদ্রা বা ইনসোমনিয়া (Insomnia) কী?

যদি বিছানায় যাওয়ার ৩০ মিনিটের মধ্যেও ঘুম না আসে, মাঝরাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায় এবং সকালে ওঠার পর শরীর সতেজ লাগে না—তবে এটি ইনসোমনিয়ার লক্ষণ। এটি দুই ধরণের হতে পারে:

  • অ্যাকিউট (স্বল্পমেয়াদী): পরীক্ষার টেনশন বা খারাপ খবরের কারণে ২-৩ দিন ঘুম না হওয়া।
  • ক্রনিক (দীর্ঘমেয়াদী): সপ্তাহে ৩ দিনের বেশি এবং ৩ মাসের বেশি সময় ধরে ঘুম না হওয়া। এর জন্য চিকিৎসার প্রয়োজন।

৪. স্লিপ অ্যাপনিয়া (Sleep Apnea): এক নীরব ঘাতক

অনেকে ঘুমানোর সময় জোরে নাক ডাকেন এবং হঠাৎ শ্বাস আটকে গিয়ে ঘুম ভেঙে যায়। একে 'অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া' বলে। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক কারণ এতে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায় এবং হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। যদি আপনার সঙ্গী বলেন যে আপনি ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ করে ফেলছেন, তবে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

৫. কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন? (Red Flags)

অবহেলা করবেন না যদি:

  • স্লিপ হাইজিন বা ঘরোয়া নিয়ম মেনে চলার পরেও ১ মাসের বেশি সময় ধরে ঘুমের সমস্যা থাকে।
  • সারাদিন অতিরিক্ত ঘুম পায় এবং গাড়ি চালানো বা কাজের সময় ঘুমিয়ে পড়েন।
  • ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্ট হয় বা দম বন্ধ হয়ে আসে।
  • পায়ের মধ্যে অস্বস্তি বা 'রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম' (RLS) অনুভব করেন।
  • ঘুমের মধ্যে হাঁটা বা কথা বলার অভ্যাস থাকে।